কেন অকালেই বুড়িয়ে যাচ্ছেন পুরুষরা? গবেষণায় উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

 


পুরুষদের অকাল বার্ধক্যের নেপথ্যে ‘ফরএভার কেমিক্যাল’: চাঞ্চল্যকর তথ্য জানাল নতুন গবেষণা

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে পুরুষদের মধ্যে অকাল বার্ধক্যের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অল্প বয়সেই চুল পেকে যাওয়া, ত্বকের সজীবতা হারানো, মাংসপেশির শিথিলতা এবং শারীরিক সক্ষমতা দ্রুত কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো অনেককেই দুশ্চিন্তায় ফেলছে। কেন এমন হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে চীনের সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল স্কুলের একদল গবেষক এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ বা পিএফএএস (PFAS) পুরুষদের দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করছে।

কী এই ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ বা পিএফএএস?

পিএফএএস (PFAS)-এর পূর্ণরূপ হলো Perfluoroalkyl and Polyfluoroalkyl Substances। এগুলো মূলত মানুষের তৈরি এক ধরনের শক্তিশালী রাসায়নিক যৌগ। আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রায় ব্যবহৃত নন-স্টিক রান্নার সরঞ্জাম, আসবাবপত্র, ওয়াটার-প্রুফ পোশাক এবং বিভিন্ন খাদ্য প্যাকেজিংয়ে এই রাসায়নিকের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এগুলোকে ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ বলা হয় কারণ এগুলো প্রকৃতিতে সহজে ভেঙে যায় না এবং পরিবেশ ও মানবদেহে বছরের পর বছর অবিকৃত অবস্থায় জমে থাকতে পারে। এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় এই কেমিক্যালকে হৃদরোগ এবং ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা হলেও, এবারই প্রথম একে বার্ধক্যের গতির সাথে সরাসরি যুক্ত করা হলো।

জৈবিক বয়স ও গবেষণার প্রেক্ষাপট

গবেষণার মূল আলোচনার বিষয় ছিল ‘বায়োলজিক্যাল এজ’ বা জৈবিক বয়স। সাধারণত আমরা জন্মতারিখ অনুযায়ী যে বয়স গণনা করি তাকে বলা হয় ক্যালেন্ডার বয়স (Chronological Age)। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, শরীরের অভ্যন্তরীণ কোষ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং মানসিক সক্ষমতার প্রকৃত অবস্থাকে বলা হয় জৈবিক বয়স। এই বয়সটি জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার ওপর নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের জৈবিক বয়স ক্যালেন্ডার বয়সের চেয়ে বেশি, তাদের শরীর দ্রুত বুড়িয়ে যায় এবং তারা নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

গবেষণার ফলাফল ও পুরুষদের ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এজিং’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একটি বৃহৎ জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মোট ৩২৬ জন নারী ও পুরুষের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে ১১ ধরনের পিএফএএস রাসায়নিকের উপস্থিতি যাচাই করেন গবেষকরা। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী পুরুষদের রক্তে যখন এই কেমিক্যালের মাত্রা বেশি থাকে, তখন তাদের জৈবিক বয়স বৃদ্ধির গতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, একই পরিবেশে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে পিএফএএস-এর এই ক্ষতিকর প্রভাব ততটা তীব্রভাবে লক্ষ্য করা যায়নি। এর অর্থ হলো, এই নির্দিষ্ট রাসায়নিকটি পুরুষদের শরীরের অভ্যন্তরীণ মেকানিজমে বেশি প্রভাব ফেলছে এবং তাদের দ্রুত বৃদ্ধ করে দিচ্ছে।

সচেতনতাই প্রতিরোধের উপায়

গবেষকরা জানিয়েছেন যে, এই ফলাফলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে সাবধানতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার কমানো, নন-স্টিক ফ্রাইপ্যানে সরাসরি উচ্চ তাপে রান্না না করা এবং মানহীন খাদ্য প্যাকেজিং এড়িয়ে চলার মাধ্যমে এই ‘ফরএভার কেমিক্যাল’-এর সংস্পর্শ কমানো সম্ভব। আমাদের পরিবেশ ও শরীরে জমে থাকা এই বিষাক্ত উপাদানগুলো এড়িয়ে চলতে পারলে অকাল বার্ধক্য রোধ করা এবং দীর্ঘায়ু লাভ করা সহজ হবে।

Next Post Previous Post

মন্তব্য করুন