ইরানকে সামরিক সহায়তা নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করল চীন
বেইজিং ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ত্রিমুখী সংঘাত যখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তখন বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি চীনের অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা কাটল। সোমবার (২ মার্চ, ২০২৬) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পরিষ্কার জানিয়েছে যে, চলমান যুদ্ধে বেইজিং তেহরানকে কোনো প্রকার সামরিক সহায়তা বা অস্ত্র সরবরাহ করবে না। চীনের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সমর্থন বনাম সামরিক দূরত্ব
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থন সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক ও নৈতিক পর্যায়ের। চীন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বেইজিংয়ের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা যখন একটি ইতিবাচক পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেই প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। চীন মনে করে, এই সামরিক পদক্ষেপ অঞ্চলটিকে একটি ‘অপরিবর্তনীয়’ এবং দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
শীর্ষ পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সোমবার ওমান, ইরান এবং ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে দীর্ঘ ফোনালাপ করেছেন। এই আলাপকালে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে সকল পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানান। যদিও চীন তেহরানের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অধিকারকে সমর্থন করে, তবে কোনো ধরনের পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার বিষয়ে সরাসরি অনুমোদন দেওয়া থেকে বেইজিং বিরত রয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ
ইরানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও চীনের এই সতর্ক অবস্থানের পেছনে কাজ করছে দেশটির নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা। সূত্র অনুযায়ী, চীনের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করতে হয়, যার অর্ধেকেরও বেশি আসে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান ছাড়াও সৌদি আরব, ইরাক এবং কুয়েত থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে এই নৌপথটি বেইজিংয়ের জন্য জীবনরেখার মতো। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে বা জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীন সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বে।
উপসংহার
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে চাচ্ছে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘একতরফা’ সামরিক আধিপত্যের বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কোনো সামরিক জোটে জড়ানো থেকে বিরত থাকছে। বেইজিংয়ের এই ‘ধীরে চলো নীতি’ যুদ্ধের মোড় কোন দিকে ঘোরায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সূত্র: আলজাজিরা।
